পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনকে বেদনাবিধূর বিদায় জুলাই 8, 2009
Posted by bangla71.net in উৎসব, জীবনী.Tags: মাইকেল জ্যাকসন, jackson, michael
trackback

কোটি কোটি ভক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চির বিদায় নিলেন পপ সঙ্গীতের একচ্ছত্র অধিপতি মাইকেল জ্যাকসন। বাংলাদেশ সময় ৭ জুলাই মঙ্গলবার গভীর রাতে পপ সম্রাটকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। সোনায় মোড়ানো কফিনে করে মাইকেল জ্যাকসনকে সমাহিত করা হয়। এর আগে পপ সম্রাটের স্মরণে লসএঞ্জেলেসের স্টাপলস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় গণস্মরণ অনুষ্ঠান। পপ সম্রাটের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এখানে তার কফিন নিয়ে আসা হয়। এ সময় হূদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনুষ্ঠানে সাড়ে ছয় হাজার গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ প্রায় ১৮ হাজার লোক অংশ নেয়। স্টাপলস সেন্টারের চারপাশে জড়ো হয় আরও ৭ লাখ লোক। বিশাল টিভি স্ক্রিনে তারা সেন্টারের ভেতরের দৃশ্য অবলোকন করেন। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি টিভি চ্যানেল গণস্মরণ অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করায় আরও কয়েকশ’ কোটি লোক অনুষ্ঠানটি দেখার সুযোগ পায়। এদিকে চির বিদায় জানানোর আগে রাশিয়ায় বসে সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মাইকেল জ্যাকসনকে এ প্রজন্মের সর্বশ্রেষ্ঠ বিনোদন তারকা হিসেবে উল্লেখ করেন। জ্যাকসনকে তিনি তার অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে অভিহিত করেন।
মাইকেল জ্যাকসন ২৫ জুন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এলভিস প্রেসলি, প্রিন্সেস ডায়ানার মতো তার মৃত্যুটাও ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে বিশ্বের কোটি কোটি জ্যাকসনভক্ত শোকে হতবিহ্বল হয়ে যান। দাবি ওঠে, মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের। মৃত্যু রহস্য উন্মোচনের জন্য এ পর্যন্ত দু’বার মাইকেল জ্যাকসনের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। রিপোর্ট না আসায় মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও অজানাই রয়ে গেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বেদনানাশক ইনজেকশন ও নেশাজাতীয় ওষুধ অতিমাত্রায় গ্রহণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু রহস্য নিয়ে যখন তোলপাড় চলছিল ঠিক সে সময়ই দুনিয়া কাঁপানো এ শিল্পীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। মঙ্গলবার তাকে চির বিদায় জানানো হবে- এ খবর পরিবারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয় কয়েকদিন আগে। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জ্যাকসনের শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে ১৭ হাজার ৫শ’ জনকে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। এদের মধ্যে ৬ হাজার ৫শ’ ভিআইপি ও ১১ হাজার সাধারণ লোক। বিশ্বের যে কোন দেশ থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য আবেদন করা যাবে। এ ঘোষণার পর লাখ লাখ লোক হুমড়ি খেয়ে পড়ে। লটারিতে বিজয়ীরা লসএঞ্জেলেসের ডোগার স্টেডিয়াম থেকে টিকিট ও বাহুবন্দনি সংগ্রহ করে স্টাপলস সেন্টারে প্রবেশ করে । ভিআইপিদের টিকিট ইসু করা হয় স্থানীয় নকিয়া সেন্টার থেকে।
অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার বার্তা পড়ে শোনানো হয়। তিনি বলেছেন, মাইকেল ছিলেন সঙ্গীত অঙ্গনে একই সঙ্গে একজন দৈত্য এবং কিংবদন্তী! তার পরিবার এবং ভক্তদের সঙ্গে আমিও গভীর শোক প্রকাশ করছি। তার মেধা নিয়ে আমাদের মনে কোনো সংশয় ছিল না। বারবার বিভিন্ন বিরূপ পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি যেভাবে জয় পেয়েছেন তার প্রশংসা না করেও পারা যায় না। আমি, আমার স্ত্রী, আমার পরিবার, আমার বন্ধুরা জ্যাকসনের শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। শোককে জয় করে শক্তি সঞ্চয় করুন।
পপ সম্রাটের কফিন প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় হলিউড হিলসের করেস্টলন মেমোরিয়াল পার্কে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আ্তীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের বিশাল গাড়িবহর সেখানে পৌঁছে। এখানকার গির্জায় ৯০ মিনিটের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় জ্যাকসনের তিন সন্তান, ভাইবোন, মা-বাবাসহ ঘনিষ্ঠজনরা অংশ নেন। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আরও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন স্টিভ ওয়ান্ডার, মারাইয়া কেরি, লিওনেল রিচি, কোবে ব্রায়ান্ট, মার্টিন লুথার কিং ৩য়, ব্রুকশিল্ড, বেরিগ্রুডি প্রমুখ। জ্যাকসনের সাবেক স্ত্রী ডেবি রোয়ে অবশ্য এখানে ছিলেন না। নিতান্ত ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠিত দেড় ঘণ্টার ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে পপ সম্রাটের কফিন নিয়ে আসা হয় স্টাপলস সেন্টারে। এখানে গণস্মরণ অনুষ্ঠানে পপ সম্রাটের জীবনের নানা দিক তুলে ধরে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। । এরপর জ্যাকসনের সহকর্মী, বন্ধু ও আ্তীয়স্বজনরা তার জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বক্তাদের কথাবার্তার মাঝে মাঝে পরিবেশন করা হয় শোকাবহ সঙ্গীত। মঞ্চের বিশাল স্ক্রিনে মাইকেল জ্যাকসনের নানা ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়। ফুলে ঘেরা তার কফিনটি রাখা হয় মঞ্চের মাঝামাঝি জায়গায়। জ্যাকসনের ভাইয়েরা কফিনটি বয়ে আনেন। স্টাপলস সেন্টারে যেসব সেলিব্রিটি অংশ নেন তাদের মধ্যে হচ্ছেন ব্রায়ান্ট, মারাইয়া ক্যারি, এন্ড্রু ক্রাউচ চোরি, জেনিফার হাডসন, ম্যাজিক জনসন, জন মায়ার, মার্টিন লুথার কিং ৩য়, স্টিভ ওয়ান্ডার প্রমুখ। আই উইল বি দেয়ার গানটি গাওয়ার সময় মারাইয়া ক্যারি গেয়ে ওঠেন, উই নেভার সে গুডবাই।
৫০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের ৪০ বছরই তিনি বিশ্বকে মাতিয়ে রাখেন তার ভুবন ভোলানো গান আর জাদুকরী নৃত্য দিয়ে। চার দশকের সঙ্গীত জীবনে এ মহান শিল্পীর বিক্রিত গানের অ্যালবাম সংখ্যা ৭৫ কোটিরও বেশি। গানের অ্যালবাম বিক্রির এটা বিশ্বরেকর্ড। জ্যাকসন উন্মাদনায় গোটাবিশ্ব ছিল পাগল। যেখানে গেছেন একনজর দেখার জন্য লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। জ্যাকসনের গান শুনতে গিয়ে ইওরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত শতাধিক লোক ভিড়ের চাপে মারা গেছে। রাষ্ট্রনায়ক না হয়েও তিনি বিশ্বের যেখানে গেছেন সেখানেই রাষ্ট্রের অধিকর্তার চেয়েও বেশি সম্মান পেয়েছেন। এত যশ খ্যাতি প্রতিপত্তি ও প্রাচুর্য সত্ত্বেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অসুখী ও নিঃসঙ্গ। দু’বার বিয়ে করেন, দু’বারই তার সংসার ভেঙে যায়। কথিত শিশু নির্যাতনের অভিযোগে কয়েকবার তাকে আমেরিকান সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। বারবার প্ল্লাস্টিক সার্জারি করায় এবং দেহে নানা ধরনের হরমোন নেয়ায় প্রবাদপ্রতীম এ শিল্পীর শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ব্যথায় কাতরাতেন তিনি। এজন্য অতিরিক্ত বেদনানাশক ইনজেকশন নিতে হতো তাকে। আর এভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।




মন্তব্য»
No comments yet — be the first.