jump to navigation

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন দিগন্তের প্রত্যাশায় ওবামা জুন 6, 2009

Posted by bangla71.net in আন্তর্জাতিক, আরব, সংবাদ, সমসাময়িক.
Tags: , , , , ,
trackback

প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক শুরুর জন্য মুসলিম বিশ্বের কাছে আহবান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি বলেন, এখন বিভেদ সৃষ্টির সময় নয় বরং এখন সময় সকল সংকটে অংশীদার হওয়ার। এ ভাষণে নিজের ইসলামি জীবনের কথা বলেন বারাক হুসেন ওবামা।

‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে ভাষণ শুরু করেন ওবামা। তিনি মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন শরিফ থেকে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিলে করতালিতে ফেটে পড়ে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড হলরুম। ভাষণ শেষে তিনি মিসর ত্যাগ করে ইউরোপের উদ্দেশে রওয়ানা হন। সফরের শুরুতে তিনি জার্মানিতে বুশেনাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন।

প্রায় তিন হাজার আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

প্রায় তিন হাজার আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

ভাষণের শুরু ওবামা কায়রোতে তাকে সম্মান দেখানোর জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও মুসলিম বিশ্বের শান্তি কামনা করে বক্তব্য শুরু করেন। ওবামা বলেন, আমরা একসঙ্গে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে পারি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে পারি। তবে আমাদের সন্দেহের চক্র এবং মতবিরোধের অবসান ঘটাতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা এবং ইরাক যুদ্ধের কারণে যে বিভেদের সৃষ্টি হয়েছিল তা নিরসনের লক্ষ্যে তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দূর করা যুক্তরাষ্ট্রর প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার দায়িত্ব। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বের ভুল ধারণার পরিবর্তন হওয়া উচিত। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের যুদ্ধ এবং আল-কায়েদার নৃশংসতা সম্পর্কে তিনি বলেন, মুসলমানদের চরমপন্থা মানবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তিনি বলেন, ইসলাম কোনো সমস্যা সমাধানে চরমপন্থা অবলম্বন করাকে সমর্থন করে না। বরং ইসলাম শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

ওবামা বলেন, ভিন্ন দুটি ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতিযোগী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মুসলিম বিশ্বে বিশ্বায়নের প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত হবার কিছু নেই। কারণ উন্নয়ন এবং সংস্কৃতির মধ্যে সংঘাতের কোনো সুযোগ নেই। ভাষণের আগে ওবামা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া এবং ইরানের বিরোধপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের সঙ্গে আলোচনা করেন।

প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্যের সময় উপস্খিত আরব বিশ্বের নেতাদের একাংশকে দেখা যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্যের সময় উপস্খিত আরব বিশ্বের নেতাদের একাংশকে দেখা যাচ্ছে।

 

পুর্ণাঙ্গ ভাষণ

ওবামা বলেন, প্রায় এক হাজার বছর আগে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কায়রোর এ বিশ্ববিদ্যালয়কে মিসরের উন্নয়নের উৎস বলে বর্ণনা করে ওবামা বলেন, আমরা এমন সময়ে মিলিত হয়েছি যখন যুক্তরাষ্টন্স এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সহ-অবস্খান এবং সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল। তবে এর সঙ্গে ছিল সংঘাত এবং ধর্মযুদ্ধও। ঔপনিবেশিক কারণেই মুসলমানদের স্বার্থ এবং অধিকার লঙ্ঘিত হয়। তাছাড়া বিশ্বায়নের ও আধুনিকীকরণের কারণে ইসলামি ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, মুসলমান নামধারী কিছুসংখ্যক চরমপন্থিও এ বিভেদের কারণ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর বিভিন্ন হামলা মুসলমান এবং পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ককে অবনতির দিকে নিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইসলামি ঐতিহ্য

ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার জন্য আমি এখানে এসেছি। এ সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ এবং শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। এ পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। এ ভাষণ বছরের পর বছর ধরে গড়া অবিশ্বাসের শেষ করতে পারে না। পরস্পরকে বোঝার জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে। একে অপরকে সম্মান করতে হবে। তিনি কোরআন শরিফের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আল্লাহ তার ওপর মানুষকে বিশ্বাস রাখতে বলেছেন এবং সবসময় সত্য কথা বলতে বলেছেন। আমি একজন খ্রিস্টান কিন্তু আমার বাবা একজন মুসলিম। তিনি মুসলমানদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, সভ্যতা ইসলামের কাছে ঋণী। বীজগণিত, ম্যাগনেটিক কম্পাস এবং নেভিগেশনের অনেক যন্ত্রপাতি, চিকিৎশাস্ত্রে ইসলামের অবদান রয়েছে। ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অংশ। মুসলিম প্রধান দেশ মরক্কো সর্বপ্রথম স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছিল। মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতিতে অবদান রেখেছে। তারা আমাদের হয়ে যুদ্ধ করেছে, প্রশাসনে কাজ করছে, ব্যবসা করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে, নোবেল পেয়েছে, ক্রীড়ায় নৈপূণ্য দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ উদ্ধারে কখনো হিংস্র হতে পারে না। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়নের অন্যতম উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা মানুষের সমতা ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য শত শত বছর লড়াই করেছি। নিজেদের দেশসহ সারা বিশ্বে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিকের স্বাধীনতা অবিচ্ছেদ্য। এখানে মুসলমানরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। আমাদের দেশে প্রায় ১২’শর মতো মসজিদ রয়েছে। বিচার বিভাগ নারী এবং মেয়েদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট। তাই ইসলাম যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় অংশ তাতে কোন সন্দেহ নেই।

প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ওবামাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে।

শৈশবে আমি ইন্দোনেশিয়াতে কাটিয়েছি। সেখানে ইসলামের দর্শন দেখেছি। যুবক বয়সে শিকাগোতে কাজ করার সময় আমি মুসলমানদের বিশ্বাস এবং ধর্মের প্রতি আনুগত্য দেখেছি। আমাদের সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোণ সৃষ্টিই আমাদের কাজের লক্ষ্য। এর জন্য বছরের পর বছর কাজ করতে হবে। মন্দায় আক্রান্ত হওয়ার পর আমরা বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। যখন সোয়াইন ফ্লুর সংক্রমণ হলো তখন আমারা সবাই ঝুঁকির মধ্যে ছিলাম। যখন একটি দেশ পরমাণু পরীক্ষা চালাল তখন আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়েছি। যখন দারফুর এবং বসনিয়াতে নিরীহ মানুষদের হত্যা করা হয়েছে তখন তা আমাদের সকলের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। মানুষ হিসেবে একে অন্যের ভালোর জন্য কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। এটা কঠিন কাজ। কারণ ইতিহাস থেকে দেখা যায় সব সময় একজন অন্যকে শোষণ করার চেষ্টা করেছে নিজের স্বার্থের জন্য। বর্তমান সময়ে নিজের আত্মরক্ষার জন্য মানুষ এমনটা করছে।

ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার

ওবামা বলেন, একদিকে ইরাকের ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা এবং ইরাকের দায়িত্ব ইরাকিদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। ইরাকি জনগণের কাছে আমি তা পরিষ্কার করেছি। তাদের ওখানে মার্কিনিদের ঘাঁটি গেড়ে বসা বা তাদের সম্পদের ওপর কোনো দাবি আমাদের নেই। ইরাকের সার্বভৌমত্ব তার নিজের। তাই আগামী আগস্ট থেকেই সেনা প্রত্যাহারের আদেশ দিয়েছি যাতে ২০১২ সালের মধ্যে সব সেনা সরিয়ে আনতে পারি। ইরাকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি রক্ষা করতে আমরা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেব এবং তাদের উন্নয়নে সহায়তা করব। কিন্তু আমরা একটি নিরাপদ ও একতাবদ্ধ ইরাককে বন্ধু হিসেবে সমর্থন করে যেতে চাই কোনো পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নয়।

গুয়ান্তনামো বন্দিশিবির

ওবামা বলেন, চূড়ান্ত কথা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কখনোই চরমপন্থিদের কার্যকলাপ সহ্য করবে না। এ মার্কিন নীতির কোনো পরিবর্তন কখনোই হবে না। আমাদের দেশের জন্য ৯/১১ প্রবল আতঙ্কের একটি বিষয়। এর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা আমাদের আদর্শ থেকে সরতে বাধ্য হয়েছি। এখন আমরা গতিপথ পরিবর্তন করেছি। মার্কিন সেনাদের বন্দি জিজ্ঞাসাবাদের কিছু উপায় নিষিদ্ধ করেছি এবং আগামী বছরের শুরুতে গুয়ান্তানামো বন্দিশিবির বন্ধ করে দেয়া হবে।

প্রেসিডেন্ট ওবামা তার সফরের মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনে মোবারক এর সাথে বৈঠক করেন।

প্রেসিডেন্ট ওবামা তার সফরের মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনে মোবারক এর সাথে বৈঠক করেন।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্ক

ওবামা বলেন, উদ্বেগের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো ইসরায়েল, ফিলিস্তিন এবং আরব বিশ্বের মধ্যে পরিস্খিতি নিয়ে আলোচনায় বসা প্রয়োজন। গোটা বিশ্বজুড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ইহুদিরা দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মধ্যে দুর্ভোগের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬০ লাখ ইহুদি গণহত্যার শিকার হয় যা বর্তমান ইসরায়েলের মোট জনগোষ্ঠীর সমপরিমাণ। এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা ভিত্তিহীন ও ঘৃণ্য। এ বেদনাদায়ক ঘটনার উল্লেখ ইসরায়েলিদের কষ্টের স্মৃতি মনে পড়িয়ে দিয়ে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে যা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হবে না।

আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও তালেবান

ওবামা বলেন, ৭ বছর আগে তালেবানরা ৩ হাজার লোককে হত্যা করেছিল। যাদের মধ্যে ছিল নিরপরাধ শিশু, নারী, পুরুষ। এরা যুক্তরাষ্ট্রের এবং আরো অনেক দেশের নাগরিক যারা কারো কোনো ক্ষতি করেনি। প্রয়োজনই তখন আফগানিস্তানের ব্যাপারে মার্কিন নীতি ঠিক করে দিয়েছিল। এখনো তালেবানরা নির্লজ্জভাবে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার জন্য টার্গেট করে আবার হামলার দায়ও স্বীকার করে এবং তার আরো বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের নেটওয়ার্ক বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের মোকাবিলার ব্যাপারে কোনো বিতর্কই আসতে পারে না।

আমরা আফগানিস্তানে আমাদের সেনা রাখতে চাই না এ ব্যাপারে কোনো ভুল নেই। আমরা ওখানে কোনো সামরিক ঘাঁটির সন্ধান করছি না। এ সংঘাত অব্যাহত রাখা ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবেও কঠিন। চরমপন্থিরা বিভিন্ন দেশে নানা ধর্মের মানুষকে হত্যা করছে যাদের মধ্যে মুসলমানও রয়েছে। অথচ পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যে একজন নিরপরাধকে হত্যা করল সে গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল, আবার যে একজন মানুষকে রক্ষা করল সে গোটা মানবজাতিকে রক্ষা করল। শুধুমাত্র সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে শান্তি ফিরে আসবে না জানি। তাই আগামী ৫ বছর প্রতিবছর পাকিস্তানকে ১০৫ কোটি ডলার এবং আফগানিস্তানকে ২০৪ কোটি ডলার উন্নয়ন সহায়তা দেয়া হবে।

প্রেসিডেন্ট ওবামার ভাষনের পর সেক্রেটারি অব ষ্টেট হিলারী ক্লিনটনকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে দেখা যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ওবামার ভাষনের পর সেক্রেটারি অব ষ্টেট হিলারী ক্লিনটনকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে দেখা যাচ্ছে।

ইরান

ওবাম বলেন, আমাদের উদ্বেগের আরেক দিক হলো পারমাণবিক অস্ত্র রাখার অধিকার ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে। এ ইসু নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজমান। ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে তবে, এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। ইরানের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালুর কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, কিছু দেশ মনে করে শুধু সেই পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন হতে পারবে আর কেউ নয়। কিন্তু কোনো দেশেরই পরমাণু শক্তির ওপর একক আধিপত্য থাকা উচিত নয়। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো দেশেরই পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির আওতায় থেকে কারো জন্য হুমকি না হয়। আমি আশা করব এ অঞ্চলের সবাই পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত এলাকা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবে।

গণতন্ত্র ও অধিকার

ওবামা বলেন, আমি জানি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বে গণতন্ত্রে উত্তরণ নিয়ে কিছু বির্তক আছে আর ইরাক যুদ্ধ নিয়েই এ বির্তকটা সবচেয়ে বেশি। এখানে আমি একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই, তা হলো কোনো দেশেরই উচিত না একটি দেশের পদ্ধতি আরেকটি দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া। প্রত্যেক দেশেরই সাধারণ জনগণের প্রধান চাহিদাগুলো সরকারকে তার নিজস্ব উপায়েই সমাধান করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কারো ওপর চাপ দিবে না। যুক্তরাষ্ট্র শুধু চায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেক ব্যক্তিরই চিন্তা করার, নিজের মনের কথা প্রকাশ করার এবং তার সরকার কেমন হবে তা প্রকাশ ও জানানোর অধিকার এবং ক্ষমতা আছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমঅধিকার ও বিচার পাওয়ার অধিকার, সরকারের স্বচ্ছতা এবং জনগণের সম্পদের চুরি করবে না এমন নিশ্চয়তা চাওয়ার অধিকার আছে। আছে স্বাধীন জীবন বেছে নেয়ার অধিকারও। এটা মার্কিনিদের কোনো ধারণা নয় বরং মানবিক অধিকার। তাই আমরা বিশ্বে সর্বত্র তাদের সমর্থন দেব।

আমরা সকল নির্বাচিত এবং শান্তিপূর্ণ সরকার যারা তাদের জনগণের অধিকার নিশ্চিত করে তাদেরকে স্বাগত জানাই। তাদেরকে সচেতনভাবে ক্ষমতার ব্যবহার করতে হবে। সংখ্যালঘুদের অধিকারকেও সন্মান করি। এই অধিকারগুলোর সঠিক প্রয়োগ ছাড়া একটি দেশে গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না ।

বাগদাদের একটি কফি শপে ওবামার বক্তব্য শুনতে দেখা যাচ্ছে।

বাগদাদের একটি কফি শপে ওবামার বক্তব্য শুনতে দেখা যাচ্ছে।

ধর্মীয় স্বাধীনতা

ইসলাম তার সহনশীলতার জন্য গর্ব করতে পারে। আন্দালুসিয়া এবং কর্দোভার ইতিহাস থেকে আমরা এই বিষয়টিই দেখতে পাই। আমার কৈশোরের প্রথম দিকে মুসলিম অধ্যুষিত ইন্দোনেশিয়াতেও আমি দেখেছি খ্রিস্টানরা সেখানে স্বাধীনভাবে থেকেছে। প্রত্যেক দেশেই প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীন বিশ্বাসের সঙ্গে তাদের কাজ করতে পারার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু অনেক দেশেই এই অধিকার নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে গেছে।

কিছু মুসলমানের মধ্যে ধ্বংসাতক লক্ষণ দেখা যায় যারা অন্যের বিশ্বাস ভঙ্গ করতে চায়। লেবাননের সংখ্যালঘু কিংবা মিসরের খ্রিস্টানরাও এদের শিকার হতে পারে। আবার মুসলমাদের শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদও সহিংসতার সৃষ্টি করে যা ইরাকেই বেশি দেখা যায়। ধর্মীয় স্বাধীনতার মূল হলো সবার একসঙ্গে বসবাস করা। আমরা সব সময়ই এ বিষয়টি প্রতি লক্ষ্য রাখব। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমরা স্বাধীন ভাবে বসবাস করছে এবং তাদের ধর্ম পালন করছে নির্বিঘ্নে। তাই আমি অঙ্গিকারবদ্ধ যেন আমেরিকার মুসলমানরা তাদের যাকাত দিতে পারে।

মুসলিম দেশগুলোর স্বাধীনতার ওপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় পশ্চিমাদেশগুলোর। কেননা মুসলমানরা তাদের জন্য ইসলামের মূল্যবোধকেই সঠিক মনে করে। একইভাবে পোশাকের ক্ষেত্রেও কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়।

নারী অধিকার

এখানে আমি বলতে চাই যে নারী শিক্ষিত সে ততো বেশি সমৃদ্ধ, সেটা সব দিক দিয়েই। নারীদের সমধিকারের বিষয়টি কেবল ইসলামেরই ইসু নয়। আমরা দেখেছি বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় নারীরা দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশসহ আফ্রিকায় নারীদের সমধিকার অর্জনে অনেক বাধা রয়েছে। একটি ছেলে যেমন পরিবারের জন্য সম্পদ হতে পারে তেমনি একটি মেয়েও হতে পারে। উন্নয়নের জন্য মেয়ে-ছেলেকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখানে নারীপুরুষ কোনো বিষয় নয় বরং একত্রে নিজের সর্বোচ্চ সফলতা বের করে নিয়ে আসাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

প্রেসিডেন্ট ওবামা ও সেক্রেটারি অব ষ্টেট হিলারী ক্লিনটনকে কায়রোর সুলতান হাসান মসজিদে দেখা যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ওবামা ও সেক্রেটারি অব ষ্টেট হিলারী ক্লিনটনকে কায়রোর সুলতান হাসান মসজিদে দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষা ,বিজ্ঞান, বাণিজ্যে সহযোগিতা

আমরা মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে যেকোন মুসলিম দেশকে সহযোগিতা করব। তেমনিভাবে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যম্যে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করব। আমি মনে করি সকল মেয়েরই জীবন ধারণে নিজের ইচ্ছার বহি:প্রকাশ থাকতে হবে।

ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের ফলে তথ্য ও জ্ঞানের প্রসার ঘটবে। যদিও সেটি অনেকসময় যৌনতা ও সহিংসতাকে বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসার ফলে নতুন সম্পদের আর্বিভাব হবে যা নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এতে আমারদেশসহ অনেক দেশেই ভয় তৈরি হতে পারে। ভয়টা নতুনের। নতুনের ফলে পুরাতন ধারার রাজনীতি, নিজেদের পরিচয়, অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যেমন উন্নতি করেছে তেমনি তাদের ঐতিহ্যও ধরে রেখেছে। একই সত্য প্রযোজ্য মুসলিমদেশগুলোর ক্ষেত্রেও। আদিকাল থেকে এখন পর্যন্তও মুসলমানরা নতুন আবিষ্কার ও শিক্ষার প্রসারে অগ্রগামি ভূমিকা পালন করে এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশে তেল শিল্পের কারণে ব্যাপক অগ্রগতি এবং উন্নয়নের প্রসার ঘটছে। তবে একুশ শতকের উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হবে শিক্ষা ও নতুনের উদ্ভাবন।

কায়রোর গিজায় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে দেখা যাচ্ছে।

কায়রোর গিজায় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে দেখা যাচ্ছে।

অনেক দেশে প্রচুর বিনিয়োগ হলেও কিছু দেশ পিছিয়ে আছে। আমরা সেসব দেশে বিনিয়োগ করতে চাই। আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেবল তেল গ্যাসের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, তবে এখন থেকে আমরা পরিসরটা বাড়াব।

মুসলিম দেশগুলোতে যাতে আরো বেশি মার্কিন ছাত্র পড়তে পারে সে ব্যাপারেও আমরা উৎসাহ দেব। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ছাত্ররা যেন ইন্টার্নিশিপ করতে পারে সেটিও আমরা নিশ্চিত করতে চাই। শিশু ও শিক্ষকদের অন-লাইন শিক্ষায় আরো বেশি বিনিয়োগ করে নতুন অনলাইন নেটওয়ার্ক গড়তে চাই।

আমরা মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় করতে চাই। সে লক্ষ্যে আমরা এবছরই একটি ইন্টারপ্রেনারশিপ সম্মেলনের আয়োজন করব। মুসলিম দেশগুলো যাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অগ্রগতি করতে পারে সেজন্য নতুন একটি ফান্ড গঠন করা হবে। আমরা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করব।

শেষ কথা

আমি যতগুলো বিষয়ে কথা বলেছি সেগুলো হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একা করা সম্ভব হবে না, সেজন্য আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, বন্ধ করা ততটাই কঠিন। সেজন্য আমাদেরকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা পৃথিবীকে যেভাবে দেখতে চাই সেভাবে গড়ে তোলার সামর্থ্য আমাদের আছে। নতুন করে শুরু করতে কেবল দরকার সাহসের। কোরআনে লেখা আছে, ‘হে মানবজাতি আমি তোমাদের পুরুষ নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছি, তোমাদের জাতি ও সম্প্রদায়ে ভাগ করেছি যেন তোমরা পরস্পরকে জানতে পারো।’ আমরা জানি ঈশ্বর শান্তিই চান। সে লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে। সবাইকে ধন্যবাদ। আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

মন্তব্য»

1. Hossain - ডিসেম্বর 11, 2009

Read in bangla: Obama ekjon valo prasident jodi tar kaj valo hoy. tini jodi bisshe shanti chan tahole prothome-e iraq o afganistane, palestain-e shanti firie ante hobe. no hole obama o bosh ==